আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থেকে বিএনপির নেতৃত্বে: বকুলকে ঘিরে প্রশ্ন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক অতীত, নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং এলাকায় প্রভাব নিয়ে স্থানীয় মহলে নানা দাবি
নরসিংদীর মনোহরদী-বেলাবের রাজনীতিতে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম। এখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই বিএনপি নেতার রাজনৈতিক জীবনের একটি আলোচিত দিক হলো আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আলোচনা। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সঙ্গে পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে বহুদিন ধরে আলোচিত।
আত্মীয়তা ও ক্ষমতার সংযোগ
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বকুল ও নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখা হয় না; তাঁদের আত্মীয়তার কথাও বলা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের প্রচলিত বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় বকুল ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে এলাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রেখেছিলেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান মজবুত করার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
পারিবারিক পরিমণ্ডলেও আওয়ামী লীগের উপস্থিতি
বকুলের পরিবারের কয়েকজনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার কথাও স্থানীয় আলোচনায় উঠে আসে। তাঁর মেয়ের শ্বশুর আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ আ.স.ম. ফিরোজ। বড় বোনের ছেলে ফখরুল মান্নান মুক্ত চালাকচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাঁর বড় ভাই মোয়াজ্জেম হোসেন বুলবুল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সরকার পতনের পরও যোগাযোগের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও বকুলের সঙ্গে দলটির কিছু নেতা-কর্মীর যোগাযোগ অব্যাহত ছিল—এমন অভিযোগ স্থানীয় রাজনীতিতে রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, মামলা বা প্রশাসনিক চাপে থাকা কয়েকজন নেতার পক্ষে তিনি নেপথ্যে সমন্বয় করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলা, প্রশাসনিক নথি ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
বিএনপির ভেতরেও বিরোধের ইতিহাস
বকুলের অতীত ভূমিকা নিয়ে বিএনপির মধ্যেও মতবিরোধের কথা রয়েছে। নরসিংদী জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার অভিযোগ করে বলেছেন, “ওয়ান-ইলেভেনের সময় বকুল বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—‘নষ্ট মায়ের নষ্ট ছেলে’। একজন নেতা হয়েও তিনি দলের চরম ক্ষতি করেছেন।”
বকুল একসময় বিএনপি নেতা মান্নান ভূঁইয়ার অনুসারী ছিলেন এবং পরে দলীয় বিভাজনে ভূমিকা রেখেছিলেন—এমন অভিযোগও স্থানীয় রাজনীতিতে রয়েছে।
বালু, মাটি ও চাঁদার অভিযোগ
রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি মনোহরদী-বেলাব এলাকায় অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়েও বকুলকে ঘিরে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নদী থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনের ব্যবসায় তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা যুক্ত—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ৫ আগস্টের পর ব্যাপক বালু-মাটি উত্তোলনে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি করা হয়েছে।
বাজার, সিএনজি স্টেশন ও ইটভাটা থেকে বকুলের অনুসারীদের মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কর্মীর দাবি, বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে একটি প্রভাববলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে
বর্তমানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বকুলের অতীত সম্পর্ক এবং ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরছে:
• আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ধরন কী ছিল?
• সেই সম্পর্ক তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে কী প্রভাব ফেলেছিল?
• সরকার পরিবর্তনের পরও ওই যোগাযোগের কোনো অংশ সক্রিয় আছে কি?
• এখন তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব স্থানীয় প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কতটা কার্যকর?
একজন বর্তমান মন্ত্রীর রাজনৈতিক অতীত ও প্রভাব নিয়ে আলোচনায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অভিযোগকে আলাদা করে দেখা জরুরি। অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নথির ভিত্তিতে তথ্য যাচাই করলেই বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে।
মনোহরদী-বেলাবের রাজনীতিতে বকুলের প্রভাবের পূর্ণ চিত্র তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে অতীত কর্মকাণ্ড, নথিভুক্ত সম্পর্ক এবং ক্ষমতা ব্যবহারের যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।
