শিশু হাসপাতাল থেকে মিডওয়াইফ: স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে মাঠে ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার
তৃণমূলে সেবা পৌঁছাতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা
চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তিন পরিচয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। হাসপাতাল পরিদর্শন থেকে শুরু করে জনবল সংকট নিরসন, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা তুলে ধরা বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর তৎপরতা নজর কেড়েছে।
সর্বশেষ গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রামেক) পরিদর্শনে গিয়ে তিনি দেশের পাঁচটি ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল এ বছরই চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে হাসপাতালগুলো কার্যত অব্যবহৃত ছিল। এরই মধ্যে নতুন পদ সৃষ্টির কাজ শেষ হয়েছে এবং যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনার কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী একযোগে হাসপাতালগুলোর উদ্বোধন করতে পারেন বলে জানান তিনি।
শুধু নতুন হাসপাতাল চালু করাই নয়, বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন জিয়াউদ্দিন হায়দার। রামেক পরিদর্শনের সময় তিনি হাসপাতালটির দীর্ঘদিনের জনবল, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন। ২০১৩ সালে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ৫৫০ থেকে ১ হাজার ২০০-তে উন্নীত হলেও সেই অনুপাতে জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। এখন ১ হাজার ২০০ সাধারণ শয্যার পাশাপাশি ১০০ আইসিইউ শয্যার সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মা অববাহিকায় সাপের কামড়ের প্রবণতা বেশি হওয়ায় দ্রুত অ্যান্টিভেনম সরবরাহের বিষয়েও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবায় বড় জনবল পরিকল্পনা
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে জনবল সংকটকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন জিয়াউদ্দিন হায়দার। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের প্রতিটি গ্রামীণ ইউনিয়ন এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে দুজন করে মিডওয়াইফ রাখার লক্ষ্য। এর মাধ্যমে বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও নবজাতকের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সহজলভ্য ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বড় পরিসরে নিয়োগের পাশাপাশি মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নতুন অঙ্গীকার
মিডওয়াইফারি সেবাকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা শুধু দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ রাখেননি জিয়াউদ্দিন হায়দার। গত ১৪ জুন পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব মিডওয়াইভসের ৩৪তম ত্রিবার্ষিক কংগ্রেসে বাংলাদেশের পক্ষে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ তৈরি ও মোতায়েনের অঙ্গীকার ঘোষণা করেন তিনি।
বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নির্বাহী পরিচালক ডিয়েন কেইটা পেশাদার মিডওয়াইফ তৈরিতে বাংলাদেশকে ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ফলে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনবল তৈরির এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংক থেকে মাঠপর্যায়ে
ঝালকাঠির নৈকাঠি গ্রামের সন্তান ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। পরে ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাদ্য ও পুষ্টি পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর এবং সুইডেনের উমিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুষ্টি ও এপিডেমিওলজিতে পিএইচডি অর্জন করেন।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ৩৫টি দেশে স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ব্র্যাক, এফএও, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন)-এর মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে অবসর নেন তিনি। এরপর চলতি বছরের ২২ এপ্রিল প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং দেশের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দুইয়ের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে যে উদ্যোগগুলো তিনি এগিয়ে নিচ্ছেন, সেগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং তৃণমূল পর্যায়ের দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ, নতুন শিশু হাসপাতাল চালু এবং বিদ্যমান হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ আরও মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
