‘পার’ শাখায় টাকা দিলেই পার: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বদলির হাট

পার অধিশাখার হাতে নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতি; মোটা টাকায় লোভনীয় পদ পাচ্ছেন বিগত আমলের সুবিধাভোগীরা, কেলেঙ্কারির পর বাতিল হচ্ছে একের পর এক আদেশ

ঢাকার বাইরে বদলি চাইলে ৫ লাখ, ঢাকার আশেপাশে ১০ লাখ, আর রাজধানীর ভেতরে ১৫ লাখ টাকা। পদ গুরুত্বপূর্ণ হলে দর উঠছে ২০ লাখ বা তারও বেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নের এটাই এখনকার ‘অলিখিত রেট চার্ট’ এমন অভিযোগ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের।

সূত্রগুলোর দাবি, এই রেট বেঁধে দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পার) মো. মুস্তাফিজুর রহমান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার নেতৃত্বেই মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী বলয় বা সিন্ডিকেট।

সরকার বদলের পর অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল, স্বাস্থ্যখাতে নিয়োগ-বদলির পুরনো সংস্কৃতির অবসান হবে; যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সততাই হবে পদায়নের মাপকাঠি। কিন্তু অভিযোগ বলছে, বদলি এখন আগের চেয়েও বেশি সংগঠিত একটি বাণিজ্য, যার দর আগে থেকেই ঠিক করা।

অভিযোগ অনুযায়ী বদলি-পদায়নের দর

গন্তব্য / পদকথিত দর
ঢাকার বাইরে৫ লাখ টাকা
ঢাকার আশেপাশে১০ লাখ টাকা
ঢাকার ভেতরে১৫ লাখ টাকা
গুরুত্বপূর্ণ পদ২০ লাখ বা তারও বেশি

সূত্র: মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ

হিসাবটা সরল রাজধানীর একটি চেয়ারের দাম ঢাকার বাইরের পদের ঠিক তিন গুণ। পদ যত গুরুত্বপূর্ণ, দরও তত চড়া। সূত্রগুলো বলছে, প্রতিটি পদায়নে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে কেবল বদলি-পদায়ন ঘিরেই লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

যেভাবে এক হাতে সব নিয়ন্ত্রণ

মন্ত্রণালয়ের পার অধিশাখার দায়িত্বে আছেন মুস্তাফিজুর রহমান। কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি সবই এই অধিশাখার এখতিয়ারে। ফলে কে কোথায় বসবেন, কে কতদূর এগোবেন, সেই সিদ্ধান্তের প্রধান ফটকটি তাঁর হাতে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তাঁর সম্মতি ছাড়া মন্ত্রণালয়ে একটি বদলিও সম্ভব নয়। এক ব্যক্তির হাতে এমন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণই বদলিকে পরিণত করেছে লাভজনক ব্যবসায়।

নিয়ম অনুযায়ী বদলি-পদায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা প্রশাসনিক প্রয়োজন, কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেই জায়গা এখন দখল করেছে টাকার অঙ্ক। কোন কর্মকর্তা কোন পদে যাবেন, তা নির্ধারণ হচ্ছে তিনি কত দিতে পারছেন তার ওপর।

পদের ক্রেতা কারা

এত টাকা দিয়ে পদ কিনছেন কারা? সূত্রগুলো বলছে, এই ক্রেতাদের বড় অংশই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়া কর্মকর্তা। সেই আমলের পুরনো সিন্ডিকেটগুলোই বিএনপি সরকারের সময়ে নতুন করে ‘লাইন’ ঠিক করে নিয়েছে। তাদের টাকা আছে, দুর্নীতি-লুটপাটের ফন্দিফিকির জানা আছে, সাহসও আছে। আর আছে সব মহলকে ম্যানেজ করে চলার দক্ষতা। এ কারণেই স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের কাছেও তারা ‘পছন্দের’ প্রার্থী। অন্যদিকে যাঁদের দেওয়ার মতো টাকা নেই, যোগ্যতা থাকলেও তাঁরা পড়ে থাকছেন পেছনে। ফলে যে কর্মকর্তাদের বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে জবাবদিহির মুখে পড়ার কথা ছিল, তাঁরাই এখন টাকার জোরে ফিরছেন গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে। এ যেন পুরস্কার আর শাস্তির উল্টো হিসাব।

বাতিল হওয়া আদেশ

মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বিগত সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের আকর্ষণীয় পদে বসানোর পর একাধিকবার কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছে মন্ত্রণালয়। পরে বাধ্য হয়ে বাতিল করতে হয়েছে সেসব পদায়ন। উদাহরণ:

  • সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক পদে পদায়ন
  • বরিশালের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে পদায়ন
  • বরিশালের সিভিল সার্জন পদে পদায়ন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ রকম ঘটনা আরও অনেক ঘটেছে। প্রশ্ন উঠছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব আদেশ কীভাবে জারি হলো, আর বাতিলের পর লেনদেন হওয়া টাকার কী হলো। প্রতিটি ঘটনায় একই ধারা টাকার বিনিময়ে পদায়ন, জানাজানির পর কেলেঙ্কারি, তারপর তড়িঘড়ি বাতিলের আদেশ। যাঁদের সিদ্ধান্তে এসব আদেশ জারি হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।

ফলাফল: আগের মতোই

আওয়ামী লীগ আমলে স্বাস্থ্যখাত যেমন ছিল, এখনো ঠিক তেমনটাই। পার্থক্য একটাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরনো সিন্ডিকেটগুলো এখন মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী বলয়ের অধীনে একজোট হয়ে চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আর পদের বিনিময়ে দেওয়া টাকার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।

স্বাস্থ্যখাত সরাসরি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে জড়িত। এই খাতে পদ যদি নিলামে ওঠে, তবে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত তাই এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *