মহাপরিচালকের তালিকা বদলে গেল মন্ত্রণালয়ের টেবিলে: উপসচিব পদোন্নতিতে ‘ব্যাকডেট’ কারসাজি

সিনিয়র বাদ দিয়ে জুনিয়র ও মামলায় অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম ঢোকানোর অভিযোগ যুগ্মসচিব (পার) মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে; ফাঁকা পড়ে আছে যুগ্মসচিব (পার-২)-এর স্বাক্ষরের ঘর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পাঠিয়েছিল ২৫ জনের একটি তালিকা। মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে সেই তালিকার অন্তত ছয়টি নাম বদলে গেছে, নতুন তালিকায় বসেছে পুরনো তারিখ, আর পাশ কাটানো হয়েছে নথি দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উপসচিব পদে পদোন্নতির তালিকা নিয়ে এমন অভিযোগ উঠেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পার অধিশাখার বিরুদ্ধে।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের অভিযোগ, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই কারসাজির নেপথ্যে রয়েছেন যুগ্মসচিব (পার) মো. মুস্তাফিজুর রহমান ও নতুন যোগ দেওয়া উপসচিব ডা. উম্মে হানি। প্রতিবেদকের হাতে আসা নথিপত্রে অভিযোগের বেশ কিছু অংশের মিল পাওয়া গেছে।

ঘটনাক্রম

  • ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: উপসচিব পদে পদোন্নতি বিবেচনার জন্য প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তালিকা চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠি।
  • ১৭ সেপ্টেম্বর: একই বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি।
  • ২০ সেপ্টেম্বর: ৩৩তম ব্যাচ পর্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তাদের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদনের আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি।
  • এরপর: মহাপরিচালকের অনুমোদনে ২৫ জনের জ্যেষ্ঠতার তালিকা মন্ত্রণালয়ে; সূত্রমতে যুগ্মসচিব (পার-২) সাইফুল ইসলাম নথিটি অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পাঠান।
  • মাঝপথে (অভিযোগ): নথি থামিয়ে নাম বদল; ‘একই স্মারক ও তারিখের স্থলাভিষিক্ত হবে’ লেখা নতুন চিঠি, তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৬।
  • ২৭ অক্টোবর: নতুন তালিকা থেকে একজনকে বাদ দিয়ে ২৪ জনের নাম জনপ্রশাসনে পাঠানোর প্রস্তাবসহ মন্ত্রণালয়ের নোট; তাতে যুগ্মসচিব (পার-২)-এর স্বাক্ষর নেই।

পুরনো তারিখে নতুন চিঠি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন চিঠির (স্মারক নং ডিজিএইচএস/পার-১/উপসচিব পদে পদোন্নতি/২০২৫/৭৮৬) মাথায় স্পষ্ট লেখা, এটি ‘একই স্মারক ও তারিখের স্থলাভিষিক্ত হবে’। অর্থাৎ পরে তৈরি হলেও চিঠিটি বহন করছে আগের চিঠির নম্বর ও তারিখ। সংযুক্ত তালিকার প্রতিটি পাতায় মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ চার কর্মকর্তার স্বাক্ষরের পাশেও লেখা ৫ অক্টোবর। সূত্রগুলোর দাবি, নথি মাঝপথে আটকে নতুন তালিকায় মহাপরিচালকের স্বাক্ষর নিয়ে ব্যাকডেট বসানো হয়েছে।

বাদ সিনিয়র, ঢুকলেন জুনিয়র

প্রথম তালিকার কপির সঙ্গে নতুন তালিকা মিলিয়ে দেখা যায়, বাদ পড়েছেন ডা. মুহাম্মদ রেজওয়ানুল হক, ডা. শামিমা হোসেন খান, ডা. মো. আনোয়ার হোসেন, ডা. এ.এস.এম. ফাতেহ আকরাম, ডা. রাবেয়া খাতুন ও ডা. নুজহাত নাদিয়া। তাঁদের জায়গায় এসেছেন ডা. সোহানা শিকদার, ডা. আশিকুর রাহমান, ডা. নাজমুস সালেহীন, ডা. সালমুন নাহার, ডা. মুবাশশিরা বিনতে আলম ও ডা. মো. নুর এ আলম খান। সূত্রগুলো অবশ্য বদলে যাওয়া নামের সংখ্যা সাত থেকে আট বলে দাবি করছে।

নতুন তালিকার নিজস্ব তথ্যই বলছে, ডা. মুবাশশিরা বিনতে আলম চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, মেধাক্রম ৪৪৯৩—৩৩তম ব্যাচের অন্যদের পাঁচ মাসেরও বেশি পরে। ডা. নুর এ আলম খানের মেধাক্রম ৫৯২৯, পুরো তালিকায় সবার নিচে। অথচ কোড নম্বর অনুযায়ী তাঁদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ ডা. নুজহাত নাদিয়া, ডা. ফাতেহ আকরাম ও ডা. রাবেয়া খাতুন বাদ পড়েছেন। নথিতে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।

মামলার মানদণ্ডে দুই নীতি

২৭ অক্টোবরের নোটে ডা. মো. খালিদ সাইফুল্লাহর নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, কারণ সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলা চলমান। কিন্তু নতুন যুক্ত ডা. নুর এ আলম খানের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছে; অভিযোগনামায় জানতে চাওয়া হয়েছে কেন তাঁকে বরখাস্ত বা অন্য গুরুদণ্ড দেওয়া হবে না। সেই নথির অনুলিপি গিয়েছিল যুগ্মসচিব (পারসোনেল)-এর দপ্তরেও। তবু তাঁর নাম তালিকায় বহাল, নোটে মামলার কোনো উল্লেখ নেই।

সূত্রগুলোর আরও অভিযোগ, নতুন যুক্তদের কয়েকজনের পাঁচ বছরের এসিআর নেই এবং কয়েকজন আওয়ামীপন্থী চিকিৎসক সংগঠন স্বাচিপের সদস্য।

যাঁদের পাশ কাটানো হলো

নোটে স্বাক্ষর করেছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী সচিব ও যুগ্মসচিব (পার)। কিন্তু যুগ্মসচিব (পার-২) সাইফুল ইসলামের নামের ওপরের ঘরটি ফাঁকা। সূত্রগুলোর ভাষ্য, তাঁর এবং অতিরিক্ত সচিব খোরশেদ আলমের স্বাক্ষর ছাড়া, তাঁদের পাশ কাটিয়ে নতুন তালিকা নথিতে সংযুক্ত করা বেআইনি। এক সূত্রের অভিযোগ, ‘কর্তৃত্ব কাটিয়ে সচিবকে ম্যানেজ করে এবং যোগ্যদের গায়ে মিথ্যা ট্যাগ লাগিয়ে এই অনৈতিক কাজ করা হয়েছে।’

তদন্তের দাবি

সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করে জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী আগের যোগ্য কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকাটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। পার অধিশাখাকেন্দ্রিক বলয়ের বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ আগে থেকেই আছে; পদোন্নতির তালিকায় কারসাজির এই অভিযোগ সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *