“ডাক্তার রোগীর পেছনে ঘুরবে”—বাস্তবে একজন চিকিৎসকের পেছনে ১,৪০০ মানুষ

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‘ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবে’ বক্তব্য ঘিরে সামনে এসেছে জনবল-সংকটের হিসাব

একদিকে প্রতিশ্রুতি: চিকিৎসা আর হাসপাতালের দেয়ালে আটকে থাকবে না, ডাক্তারই ছুটবেন মানুষের কাছে। অন্যদিকে বাস্তবতা: সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর লম্বা সারি, ডাক্তারের দেখা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য আর মাঠপর্যায়ের ছবির মাঝখানের এই ফাঁকটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
ডাক্তার মানুষের কাছে যাবেন—এটি বলা সহজ। কঠিন হলো, যাওয়ার মতো ডাক্তার ও তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা।
হিসাবের খাতায় ১,৩৮৯ জন
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে নিবন্ধিত চিকিৎসক আনুমানিক ০.৭২ থেকে ০.৭৩ জন। সহজ ভাষায়, একজন চিকিৎসকের ওপর গড়ে প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ মানুষের ভার। নির্দিষ্ট করে বললে, ০.৭২ ধরলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ১,৩৮৯।
বিএমডিসি ও বিভিন্ন জরিপের তথ্যে নিবন্ধিত চিকিৎসক প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার। সংখ্যাটি দেখতে বড়, কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার সামনে ছোট। উপরন্তু এই সংখ্যার ভেতরে কারা কোথায় আছেন, সেটিই আসল প্রশ্ন। কেউ সরকারি প্রতিষ্ঠানে, কেউ বেসরকারি খাতে, কেউ বিদেশে, কেউ প্রশাসনিক কাজে। এই বিন্যাস না দেখে ‘যথেষ্ট ডাক্তার আছে’ বলার সুযোগ নেই।
জাতীয় গড়ের আরেকটি সীমাবদ্ধতা আছে। রাজধানী ও বড় শহরের সঙ্গে প্রত্যন্ত উপজেলা, চর, হাওর বা দুর্গম এলাকার তুলনা চলে না। কোথাও চিকিৎসক তুলনামূলক বেশি; কোথাও পদ থাকলেও নিয়মিত উপস্থিতি ও সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
ডাক্তারের পাশে কেউ নেই
স্বাস্থ্যসেবা একজনের কাজ নয়, দলের কাজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোচিত আদর্শ কাঠামোয় একজন চিকিৎসকের সঙ্গে প্রায় তিনজন নার্স ও পাঁচজন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা, অর্থাৎ ১:৩:৫। বাংলাদেশের চিত্র সাম্প্রতিক তথ্য উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে প্রায় ১:০.৭৪:০। অর্থাৎ ডাক্তার আছেন, কিন্তু তাঁকে ঘিরে দল গড়ে ওঠেনি।
এর প্রভাব পড়ে সরাসরি রোগীর ওপর। জরুরি বিভাগ ও আইসিইউতে শয্যার সংকট, জনবলের ঘাটতি আর রোগীর চাপ তো আছেই। আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নার্সিং, ওষুধ, পর্যবেক্ষণ, অস্ত্রোপচার ও ফলোআপের ধারাবাহিকতা ছাড়া চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চিকিৎসক রোগীর কাছে গেলেও এই সবকিছু সঙ্গে যাবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
প্রতিশ্রুতি বাঁচাতে যা লাগবে
প্রতিশ্রুতি বাস্তব হতে হলে ভিত্তি গড়তে হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় চাই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী; চাই ডায়াগনস্টিক সুবিধা, ওষুধ ও ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা; আর চাই চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও জবাবদিহি।
শেষ প্রশ্ন
আকাঙ্ক্ষাটি নিঃসন্দেহে ভালো: স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতালের দরজা থেকে মানুষের দোরগোড়ায় যাক। কিন্তু প্রশ্নটি আর শুধু ‘ডাক্তার ঘুরবেন কি না’ নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষের পেছনে ঘোরার মতো যথেষ্ট ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী রাষ্ট্র কি তৈরি করতে পেরেছে? উত্তর না মিললে চমৎকার বক্তব্য আর মাঠের বাস্তবতার দূরত্ব আরও বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *