“বিএনপির মন্ত্রিসভায়, অথচ বিএনপি পরিচয়েই আপত্তি!”
দলীয় সরকারের মন্ত্রী হয়ে দলীয় পরিচয় থেকে দূরে থাকার প্রয়াস—বক্তব্যের তাৎপর্য নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্য এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়। গত ৬ জুলাই বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমাকে বিএনপি হিসেবে ট্রিট করবেন না। একজন মানুষ হিসেবে দেখুন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।”
এ বক্তব্যকে নিছক আবেগের প্রকাশ বলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ তিনি সাধারণ নাগরিক নন; তিনি একটি রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রী, আর সেই সরকারের পরিচয় বিএনপি। তাই প্রশ্নটি সরল: বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হয়েও যিনি বিএনপি পরিচয়ে বিবেচিত হতে চান না, তিনি ঠিক কোন পরিচয়ে মন্ত্রিসভায় আছেন?
দলীয় পরিচয় সংকোচের নয়
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরার অধিকার মন্ত্রীর অবশ্যই আছে। একাত্তরের স্মৃতি তাঁর ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু আপত্তির জায়গা বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে—“আমাকে বিএনপি হিসেবে ট্রিট করবেন না।” গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলীয় পরিচয় লজ্জার বিষয় নয়; বরং এই পরিচয়ের মধ্য দিয়েই একজন মন্ত্রী জনগণের কাছে রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহি করেন।
তা ছাড়া বিএনপিতে মুক্তিযোদ্ধার অভাব নেই। দলটি তার প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে তুলে ধরে, আর দলের বহু নেতা-কর্মীও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও বিএনপি পরিচয়কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর যুক্তি দুর্বল।
নিজের যুদ্ধ, নাকি সবার যুদ্ধ?
বক্তব্যে মন্ত্রী মায়ের কান্না, নয় মাসের বিচ্ছিন্নতা আর যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। এসব নিঃসন্দেহে আবেগঘন স্মৃতি। তবে মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তির কৃতিত্বের আখ্যান নয়। লাখো মানুষ জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়েছেন; অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা কোনো প্রচার ছাড়াই ইতিহাসের অংশ হয়েছেন।
এই ইতিহাসকে দলীয় পরিচয়ের বিপরীতে ব্যবহার করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি আত্মমর্যাদার প্রকাশ, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় থেকে নিজেকে আলাদা করে দেখানোর কৌশল?
দ্বৈত অবস্থান
আরও লক্ষণীয়, একই বক্তব্যে তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। অর্থাৎ দলের ইতিহাস ও নেতৃত্বের উত্তরাধিকার তিনি স্বীকার করছেন, অথচ নিজের বেলায় দলীয় পরিচয় এড়াতে চাইছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃত্বের পরিচয় যদি গৌরবের হয়, তাহলে নিজের ক্ষেত্রে সেই পরিচয় থেকে দূরত্ব রাখার প্রয়োজন কী?
তিনি চাইলে বলতে পারতেন, বিএনপির মন্ত্রী হলেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান। সেটি হতো একটি দায়িত্বশীল বক্তব্য। কিন্তু “আমাকে বিএনপি হিসেবে দেখবেন না”—এই বাক্য ভিন্ন বার্তা দেয়।
জবাব প্রত্যাশিত
মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সম্মানের। কিন্তু সেই সম্মান দিয়ে দলীয় পরিচয়কে খাটো করার প্রয়োজন নেই, বিশেষ করে যে পরিচয়ের ভরসায় তিনি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছেন। তাই কয়েকটি প্রশ্ন থেকেই যায়:
• বিএনপির মন্ত্রী হয়েও বিএনপি পরিচয়ে আপত্তি কেন?
• দলের অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে নিজের পরিচয়কে আলাদা করে তুলে ধরার প্রয়োজন কী?
• যে দলের সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, প্রকাশ্য মঞ্চে সেই দলের পরিচয় এড়িয়ে তিনি কাকে বার্তা দিচ্ছেন?
