স্বাস্থ্য খাতে কি ফিরছে কথিত ‘মিঠু সিন্ডিকেট’? প্রশ্নের মুখে ‘জিরো টলারেন্স’

বিগত সরকারের আমলে আলোচিত চক্রটি ফের সক্রিয়—এমন অভিযোগে আলোচনা; মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ও পদক্ষেপ জানতে চান সংশ্লিষ্টরা

বিগত সরকারের আমলে আলোচিত কথিত ‘মিঠু সিন্ডিকেট’ স্বাস্থ্য খাতে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আগে স্বাস্থ্য খাতের নানা কেনাকাটা ও টেন্ডারে প্রভাব খাটানো এই চক্রের সদস্যরা এখন আবার সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় ঢোকার চেষ্টা করছেন। অভিযোগ আছে, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা সামনে না এসে ‘ব্যাক-ডোর’ বা পেছনের দরজা দিয়ে প্রভাব খাটাচ্ছেন।

অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে: সরকার বদলের পরও স্বাস্থ্য খাতের কথিত পুরোনো প্রভাবশালী ঠিকাদারচক্র কীভাবে ফের জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে? আরও বড় প্রশ্ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা দেওয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এসব অভিযোগের বিষয়ে কতটা জানে, এবং কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া তুলনামূলক সহজ। আসল পরীক্ষা সেই ঘোষণাকে সরকারি ক্রয় ও টেন্ডার ব্যবস্থায় কাজে পরিণত করা। স্বাস্থ্য খাতে পুরোনো কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী সত্যিই নতুন করে সক্রিয় হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করে ঠেকানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের।

তাই ‘মিঠু সিন্ডিকেট’ নিয়ে ওঠা অভিযোগকে ঠিকাদারি মহলের ভেতরের আলোচনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অভিযোগের পেছনে নথি, টেন্ডার প্রক্রিয়া বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য থাকলে তা যাচাই করা দরকার। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সেটিও স্পষ্ট করে জানানো প্রয়োজন।

এখানেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুলের জন্য বড় জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তিনি যখন ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলছেন, তখন তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীনে বড় অঙ্কের কেনাকাটা ও টেন্ডারে একই পুরোনো গোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগ উঠলে দৃশ্যমান তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

ফাইল নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্য খাতের বড় কেনাকাটা নিয়ে আগে থেকেই নানা মহলে প্রশ্ন আছে। নতুন অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়াকে ঘিরে কিছু ফাইল গোছানো হচ্ছে, আর প্রভাবশালী ঠিকাদারগোষ্ঠীগুলো নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দিতে চাইছে।

তবে মূল প্রশ্ন হলো, কোন টেন্ডারে, কোন প্রতিষ্ঠানকে, কীভাবে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে? সংশ্লিষ্ট ফাইল, দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও কার্যাদেশের তথ্য প্রকাশ্যে না এলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই কঠিন। মন্ত্রী সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হলে প্রতিটি বড় ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

নথিতেই মিলবে উত্তর

কোনো কথিত সিন্ডিকেট অতীতে প্রভাবশালী ছিল, শুধু এই অভিযোগ থাকলেই তাকে বর্তমান কোনো অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জুড়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু একই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন করে নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে তা এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

সরকারি অর্থে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় কারা অংশ নিচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠান কতবার কাজ পাচ্ছে, দরপত্রে আসল প্রতিযোগিতা কতটা হচ্ছে, একই ধরনের পণ্য বা যন্ত্রপাতি অন্যত্র কী দামে কেনা হয়েছে, আর টেন্ডারের শর্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিচ্ছে কি না—নথিপত্র পর্যালোচনা করলেই এসবের জবাব মেলে। মন্ত্রী চাইলে এসব তথ্য প্রকাশ ও স্বাধীন যাচাইয়ের সুযোগ দিয়ে ‘জিরো টলারেন্স’-এর বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে পারেন। উল্টো দিকে অভিযোগ দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে, কিংবা তদন্ত ছাড়াই একই ধরনের ঠিকাদার ও সরবরাহকারী গোষ্ঠী প্রভাবশালী অবস্থানে থাকলে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

মন্ত্রীর সামনে পরীক্ষা

অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, তা শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে যা-ই হোক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি স্পষ্ট দায়িত্ব থেকেই যায়: সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, আর ভিত্তিহীন হলে তা পরিষ্কারভাবে জানানো। কারণ নীরবতা কিংবা শুধু দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য—কোনোটিই অভিযোগের প্রকৃত নিষ্পত্তি করে না।

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা প্রমাণ হবে বক্তব্যে নয়; প্রমাণ হবে সরকারি অর্থের প্রতিটি বড় ব্যয়ে স্বচ্ছতা, প্রকৃত প্রতিযোগিতা, স্পষ্ট জবাবদিহি এবং প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *