চার দিনের বাধ্যতামূলক পর্যবেক্ষণ: ডেঙ্গুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায় শয্যা-সংকটের নতুন উদ্বেগ
হাসপাতালে জায়গা নেই, জনবলেও ঘাটতি; এর মধ্যে সব ডেঙ্গু রোগীকে চার দিন ভর্তি রাখার বক্তব্য বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে—প্রশ্ন রোগী ও স্বজনদের
দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে। অনেক সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগীদের ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দা বা করিডোরে বসেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এমন সময়ে ডেঙ্গু রোগীদের অন্তত চার দিন হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখার কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তাঁর এই বক্তব্যে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী যা বলেছেন
সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চার দিন অবজারভেশনে থাকবে, চাইলেই চলে যাওয়া যাবে না।” চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখার যুক্তি থাকলেও বর্তমান হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার বাস্তবতায় এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রোগী ও স্বজনদের একাংশ।
শয্যা ও জনবলের বাস্তবতা
তাঁদের মূল প্রশ্ন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতেই যেখানে সরকারি হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে প্রত্যেক রোগীকে বাধ্যতামূলক চার দিন ভর্তি রাখা কীভাবে সম্ভব হবে? এখন বহু হাসপাতালে রোগীর তুলনায় শয্যা কম। ভর্তি রোগীদের জায়গা দিতে গিয়ে হাসপাতালের নানা অংশে বাড়তি চাপ পড়ছে; কোথাও কোথাও বারান্দা, করিডোর বা অপ্রচলিত জায়গায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।
সংকট আরও বেড়েছে জনবলের ঘাটতিতে। রোগী বাড়লেও সেই হারে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী বাড়েনি। ফলে ভর্তির পরও রোগীরা প্রত্যাশিত মানের সেবা পাচ্ছেন কি না, সে প্রশ্নও উঠছে।
বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয়
সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা না পেয়ে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন। সেখানে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক অনেক বেশি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ছে। কয়েক দিনের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও হাসপাতাল খরচ মিলিয়ে একটি পরিবারের জন্য তা বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত বনাম নির্দিষ্ট সময়সীমা
ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখার প্রয়োজন থাকতে পারে। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তের বিভিন্ন সূচক, রক্তচাপ, পানিশূন্যতা ও জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনায় পর্যবেক্ষণের সময় ঠিক করতে চিকিৎসকেরাই সবচেয়ে উপযুক্ত। তবে সব রোগীর অবস্থা এক নয়। তাই নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থা দেখে চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও রাখা জরুরি।
যেসব হাসপাতালে এখনই পর্যাপ্ত শয্যা নেই, সেখানে চার দিনের পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক হলে নতুন রোগীদের জন্য শয্যা-সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতে হাসপাতালে চাপ বাড়তে পারে, আর ভর্তির অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ভোগান্তিও বাড়তে পারে।
রোগী ও স্বজনদের প্রত্যাশা
রোগী ও স্বজনদের একাংশ মনে করেন, এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো: পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল এবং ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের বাড়তি ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালে রাখার দিকেও নজর দিতে হবে বলে মনে করেন তাঁরা।
সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবলই যদি না থাকে, তবে চার দিন হাসপাতালে রাখার বাধ্যবাধকতা কি রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করবে, নাকি বিদ্যমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে?
ডেঙ্গু মোকাবিলায় রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি হাসপাতালের সক্ষমতা, জনবল ও শয্যা-সংকটকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। কেবল হাসপাতালে থাকার সময় বেঁধে দিলেই চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না; এর জন্য দরকার পর্যাপ্ত অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং সময়মতো সেবা।
