জনস্বাস্থ্যের প্রহরীই অরক্ষিত: আইইডিসিআরে মব হামলার দায় কার?

কর্মদিবসে দপ্তরে ঢুকে পরিচালককে মারধর, বৈঠককে ‘অপরাধ’ বললেন ড্যাব সভাপতি—স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট অবস্থান জানতে চান সংশ্লিষ্টরা

করোনা, ডেঙ্গু কিংবা নতুন কোনো সংক্রামক রোগ প্রতিটি জনস্বাস্থ্য সংকটে দেশের প্রথম সতর্কসংকেত আসে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) থেকে। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান এখন নিজেই নিরাপত্তাহীন। কর্মদিবসের মাঝামাঝি সময়ে একদল বহিরাগত পরিচালকের দপ্তরে ঢুকে তাঁকে চেয়ার থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করেছে। ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখছেন না জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা; তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য মব সন্ত্রাস আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার জন্য বড় অশনিসংকেত। হামলার নেপথ্যে প্রভাবশালী মহলের হাত আছে কি না, সেই সন্দেহও এখন প্রকাশ্য।

কক্ষে ঢুকেই চড়াও

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বেলা আনুমানিক ১১টায় অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকির নিজ কক্ষে দাপ্তরিক বৈঠক ও কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তখনই ৮–৯ জনের একটি দল ভেতরে ঢুকে পড়ে। কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই, প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তারা পরিচালককে চেয়ার থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হামলাকারীদের কাউকে আগে কখনো আইইডিসিআর প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি। তারা সংগঠিতভাবে এসে নির্দিষ্ট একজনকেই নিশানা করেছে। এ কারণে অনেকেই মনে করছেন, ঘটনাটি আকস্মিক নয়; বহিরাগতদের ব্যবহার করে আগে থেকেই এর ছক কষা হয়েছিল।

নিন্দার বদলে সাফাই

হামলার ঘটনা অস্বীকার করেননি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশীদ। তবে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় নিন্দার বদলে ছিল সাফাই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক কেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলের আলোচিত কর্মকর্তা মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। তাঁর বক্তব্যে এই বৈঠকটিই পরিচালকের ‘অপরাধ’।

এ যুক্তি মানতে নারাজ বিশ্লেষকেরা। তাঁদের বক্তব্য, পেশাগত প্রয়োজনে বা প্রতিষ্ঠানের কাজের ধারাবাহিকতার স্বার্থে সাবেক-বর্তমান যেকোনো কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হতেই পারে। আপত্তি থাকলে ব্যাখ্যা তলবের বৈধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কার্যালয়ে ঢুকে গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই। দেশের অন্যতম প্রভাবশালী পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ নেতার মুখে এমন হামলার পক্ষে যুক্তি মব সংস্কৃতিকে বৈধতা দেওয়ার শামিল বলেই মনে করছেন তাঁরা।

“ভিন্নমত দমনে যদি মারধরই হয় হাতিয়ার, তবে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই নিরাপদ নয়।”

জবাবদিহির কেন্দ্রে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ঘটনার পর স্বাস্থ্য খাত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নটি হলো একটি অতি সংবেদনশীল সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের কক্ষে বহিরাগতদের নিয়ে ঢুকে এমন মব তৈরি করা কীভাবে সম্ভব হলো? চিকিৎসা খাতের অনেকের বিশ্বাস, ক্ষমতাধর কোনো মহলের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এ দুঃসাহস কেউ দেখাত না।

এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাঃ সাখাওয়াত হোসেনের নাম। খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, আইইডিসিআর পরিচালকের সঙ্গে মন্ত্রীর নীতিগত বা প্রশাসনিক কোনো বিরোধ ছিল কি না এবং সেই ক্ষোভ থেকেই ড্যাবের ব্যানারে হামলা হয়েছে কি না। এ গুঞ্জন স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি; তবে এটি যে জনমনে প্রবল সন্দেহের জন্ম দিয়েছে, তা স্পষ্ট।

মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে জড়িত থাকুন বা না থাকুন, তাঁর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি নিজ দপ্তরেই নিরাপদ না থাকেন, তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দায় মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তির ওপরই বর্তায় বিশেষ করে যখন হামলার পক্ষে সাফাই আসে প্রভাবশালী একটি চিকিৎসক সংগঠনের প্রধানের কাছ থেকে। তাই মন্ত্রীর কাছে তিনটি বিষয় প্রত্যাশিত: স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের নির্দেশ এবং নিজের অবস্থান প্রকাশ্যে পরিষ্কার করা। লোকদেখানো বিবৃতিতে নয়, কার্যকর পদক্ষেপেই কেবল সন্দেহের অবসান সম্ভব; নীরবতা কিংবা গড়িমসি সেই সন্দেহকে আরও গভীর করবে।

দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিপজ্জনক নজির

ঘটনাটিকে “অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও লজ্জাজনক” বলে অভিহিত করেছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও খ্যাতিমান জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের চোখের সামনে যদি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হামলার শিকার হন, তাহলে মাঠপর্যায়ের গবেষক ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দেবে কে? মহামারি মোকাবিলায় যে প্রতিষ্ঠান দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা-রেখা, সেখানে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হলে তার মাশুল গুনতে হবে সাধারণ মানুষকেই। নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এ ঘটনা প্রশাসনের সর্বস্তরে এক বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *