টাকায় মিলছে সরকারি চাকরি? ইডিসিএল বগুড়ায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‘ভাতিজা’কে ঘিরে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ
কয়েক দিনে প্রায় ৩০ জনের নিয়োগ; বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ও মেধাতালিকা নিয়ে প্রশ্ন, জবাব মেলেনি মন্ত্রণালয়ের
রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) বগুড়া কারখানায় টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ‘ভাতিজা’ হিসেবে পরিচিত আজিজুর রহমান জিওনের দিকে। যে মন্ত্রী প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা দেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানেই এমন অভিযোগ ওঠায় সেই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গত কয়েক দিনে বগুড়া কারখানায় প্রায় ৩০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, এই নিয়োগের পেছনে কাজ করেছে একটি গোপন চক্র, যারা মন্ত্রীর আত্মীয়ের পরিচয় ব্যবহার করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে।
কে এই জিওন?
অভিযোগকারীরা আজিজুর রহমান জিওনকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাতিজা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, জিওন নিজে ইডিসিএলে চাকরি নেননি; বরং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে টাকার বিনিময়ে অন্যদের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। অভিযোগকারীরা জিওনের একটি ছবিও প্রচার করছেন, যা ইডিসিএলের বগুড়া কারখানার ভেতরে তোলা বলে তাঁদের দাবি।
প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানটিতে যদি তাঁর কোনো পদ না থাকে, তাহলে কারখানার ভেতরে তাঁর উপস্থিতির ব্যাখ্যা কী? নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তাঁর কথায় কাজ হয় কোন জোরে? আর অভিযোগ অনুযায়ী যে টাকা লেনদেন হয়েছে, তার শেষ গন্তব্য কোথায়?
বিজ্ঞপ্তি কোথায়, পরীক্ষা কোথায়?
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে: প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যাচাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা, তারপর মেধাতালিকা। কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৩০ জনের নিয়োগ এই পুরো প্রক্রিয়া মেনে হয়েছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নিয়োগ যদি স্বচ্ছ হয়ে থাকে, তাহলে কাগজপত্র প্রকাশে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
‘জিরো টলারেন্স’-এর পরীক্ষা এখন মন্ত্রীর নিজের ঘরে
অন্যের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া সহজ। কিন্তু অভিযোগ যখন নিজের পরিবারের দিকে আঙুল তোলে, তখনই বোঝা যায় নীতি কতটা আন্তরিক। মন্ত্রী হয়তো বলবেন, তিনি কিছু জানতেন না। কিন্তু তাঁর নাম ব্যবহার করে তাঁরই মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠানে চাকরি বিক্রির অভিযোগ উঠলে সেই অজুহাত যথেষ্ট নয়। জেনে থাকলে তা অনিয়মে প্রশ্রয়, না জানলে প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
’২৪-এর প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণা?
২০২৪-এর গণআন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল মেধার ভিত্তিতে চাকরি, তদবির ও ঘুষমুক্ত নিয়োগ। সেই আন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আবার যদি টাকায় চাকরি কেনাবেচার অভিযোগ ওঠে, আর তাতে ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর পরিবারের নাম জড়ায়, তা লাখো চাকরিপ্রার্থী তরুণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
যে প্রশ্নগুলোর জবাব জরুরি
১. কয়েক দিনে ঠিক কতজনকে, কোন কোন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে?
২. নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কবে এবং কোন মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল?
৩. পরীক্ষার ফলাফল ও মেধাতালিকা কোথায়?
৪. আজিজুর রহমান জিওনের সঙ্গে মন্ত্রীর সম্পর্ক কী, আর এই নিয়োগে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
৫. চাকরির বিনিময়ে কোনো টাকা লেনদেন হয়েছে কি?
৬. নিয়োগে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সুপারিশ ছিল কি?
৭. অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি?
অভিযোগ মিথ্যা হলে নথি প্রকাশ করে তা প্রমাণ করার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। আর সত্য হলে ‘জিরো টলারেন্স’-এর প্রথম প্রয়োগ হওয়া উচিত মন্ত্রীর নিজের ঘরেই।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং ইডিসিএল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
