১৬ হাজার কোটি টাকার স্বাস্থ্য ক্রয়: বরাদ্দ বাড়ল, এবার নজর স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থে

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বরাদ্দের এই বড় ধরনের বৃদ্ধি স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু বাজেট বাড়লেই স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি নিশ্চিত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বরাদ্দের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যয় হচ্ছে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে জনগণের বাস্তব সুফল।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে আসন্ন প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয় ও দরপত্র কার্যক্রম একটি বড় পরীক্ষা। এত বিপুল অর্থের ব্যয় শুধু অবকাঠামো বা সরঞ্জাম কেনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা, রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান।

বাড়তি বরাদ্দের সঙ্গে বাড়ছে প্রত্যাশাও

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো চিকিৎসা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়। মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩১ শতাংশ মানুষকে নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়লেও যদি ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে বাড়তি সরকারি বরাদ্দের সুফল সীমিতই থেকে যাবে।

বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি গুরুতর অসুস্থতা এখনো বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সব মিলিয়ে একটি পরিবারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু কত টাকা ব্যয় করা হবে তা নয়; বরং সেই অর্থ ব্যয়ের ফলে একজন সাধারণ রোগীর চিকিৎসা কতটা সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।

১৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কী কেনা হবে?

স্বাস্থ্য খাতে বড় অঙ্কের ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলোর একটি ছিল প্রয়োজন নির্ধারণ। কোনো হাসপাতালের বাস্তব প্রয়োজন, রোগীর চাপ, বিদ্যমান যন্ত্রপাতির অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের সক্ষমতা বিবেচনা না করে দামি যন্ত্রপাতি কেনা হলে তা শেষ পর্যন্ত অব্যবহৃত পড়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি করে।

একটি আধুনিক যন্ত্র কেনা হলেও যদি সেটি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল না থাকে, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট পাওয়া না যায় কিংবা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই ক্রয় জনগণের চিকিৎসাসেবায় কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারবে না।

সুতরাং এবারের ক্রয় পরিকল্পনায় ‘কী কেনা হবে’ প্রশ্নটির পাশাপাশি ‘কেন কেনা হবে’, ‘কোথায় ব্যবহার হবে’ এবং ‘কে ব্যবহার করবে’ এই প্রশ্নগুলোরও সুস্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন।

উপজেলা ও জেলা হাসপাতালকে অগ্রাধিকার

দেশের স্বাস্থ্যসেবার বড় একটি অংশ এখনো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি সেবা এবং পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি থাকলে রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি শক্তিশালী করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ডায়াগনস্টিক সুবিধা, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ নিজ এলাকার মধ্যেই চিকিৎসা পেতে পারে।

বিশেষায়িত সেবা যেমন ডায়ালাইসিস বা ক্যাথল্যাবের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। তবে এসব সুবিধা সম্প্রসারণের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার রোগীর চাপ, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শুধু যন্ত্র নয়, দরকার পুরো সেবা ব্যবস্থা

সরকারি স্বাস্থ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে একটি যন্ত্র কেনাকে সাফল্যের সূচক হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি মেশিন হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সেটি রোগীর কাজে লাগাতে আরও বেশ কিছু বিষয় প্রয়োজন হয়।

প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট, চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মী, রিএজেন্ট, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ এবং নিয়মিত মেরামত সবকিছুর সমন্বয়েই একটি স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কার্যকর হয়।

তাই বড় ক্রয় পরিকল্পনায় ‘লাইফ-সাইকেল কস্ট’ এবং ব্যবহার-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে সরকারি অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন কার্যকর রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

দরপত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে বড় বরাদ্দও প্রশ্নবিদ্ধ হবে

প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, ই-জিপির যথাযথ ব্যবহার, প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ এবং বাজারদরের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি।

একই সঙ্গে স্বাধীন নিরীক্ষা ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা থাকতে হবে। ক্রয়ের আগে, ক্রয়ের সময় এবং ক্রয়-পরবর্তী পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ না থাকলে শুধু নিয়ম মেনে দরপত্র সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়।

বিশেষ করে বড় অঙ্কের ক্রয়ে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা, সরবরাহকারীর প্রভাব এবং অতিরিক্ত দামে পণ্য কেনার ঝুঁকি কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।

জনবল সংকট সমাধানেও অর্থ ব্যয় জরুরি

স্বাস্থ্যসেবার মান শুধু ভবন ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি ছাড়া হাসপাতালের সক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগানো সম্ভব নয়।

তাই নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে শূন্য পদ পূরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী পদায়ন, প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতালভিত্তিক জনবল পরিকল্পনাকে একই গুরুত্ব দিতে হবে। একটি হাসপাতালে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও সেটি পরিচালনার লোক না থাকলে সেই বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য গবেষণা ও শিক্ষা যেন বাদ না পড়ে

স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও বিনিয়োগ প্রয়োজন। স্থানীয় রোগের ধরন, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণ, ওষুধের ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।

দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা জরুরি

উচ্চ Out-of-Pocket Expenditure বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা। একজন মানুষের অসুস্থতা যেন পুরো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা কেড়ে না নেয় এমন একটি সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

নাগরিক নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ

১৬ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল ক্রয় কার্যক্রমকে শুধু মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হলে ক্রয় পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা, মান এবং বাস্তবায়ন নিয়ে জনআস্থা বাড়তে পারে।

একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ কাঠামো তৈরি হলে ক্রয়ের পাশাপাশি ক্রয়-পরবর্তী ব্যবহার ও ফলাফলও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

শেষ পর্যন্ত হিসাবটা রোগীর

স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাজেটের অঙ্ক দিয়ে নয়, হাসপাতালের সেবায় পরিবর্তন দিয়ে।

সরকারের সামনে এখন তাই দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ একদিকে বিপুল অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সেই অর্থের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

১৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয় পরিকল্পনা যদি প্রয়োজনভিত্তিক, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং একই সঙ্গে ওষুধ, পরীক্ষা, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রশ্ন খুব সরল কত টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলো, সেটি নয়; বরং সেই ব্যয়ে একজন রোগীর চিকিৎসা কতটা সহজ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *