মনিটর ছোট, দাম বেশি: ১০৩০ ডায়ালাইসিস মেশিনের দরপত্রে লাভ কার?
মনিটরের আকার ১৫ ইঞ্চি থেকে নেমে এসেছে ১০ ইঞ্চিতে, অথচ মেশিনপ্রতি সম্ভাব্য দাম ২১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। কিডনি রোগীদের সেবা বাড়াতে সরকারের ১ হাজার ৩০টি ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার সর্বশেষ দরপত্রে এমন পরিবর্তনই নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। তুলনামূলক কম ফিচারের যন্ত্রের জন্য কেন বাড়তি অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব, সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
প্রায় ছয় বছর ধরে চলা এই প্রকল্পে তিন দফা দরপত্রের পরও কেনাকাটা শেষ হয়নি। প্রতিবারই গুরুত্বপূর্ণ শর্তে বদল এসেছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এসব পরিবর্তন রোগীর প্রয়োজন বিবেচনায় করা হচ্ছে, নাকি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে। সর্বশেষ দরপত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত ১৬০ কোটি টাকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে অন্তত ১ হাজার ৩০টি মেশিন সরবরাহ ও স্থাপনের অভিজ্ঞতাও চাওয়া হয়েছে।
পুরোনো প্রযুক্তির দিকে ঝোঁক?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রে আধুনিক ডাবল-পাম্প ও ডুয়েল-চেম্বার প্রযুক্তির বদলে অপেক্ষাকৃত পুরোনো সিঙ্গেল-পাম্প ও সিঙ্গেল-চেম্বার প্রযুক্তির মেশিন চাওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুতর অসুস্থ, আইসিইউ বা জটিল রোগীদের চিকিৎসায় মেশিনের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যয়ের ঝুঁকি শুধু কেনার সময়েই সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট ধরনের জীবাণুনাশক ও অন্যান্য উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হলে মেশিন কেনার পরও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি খরচ বাড়তে পারে। ডায়ালাইজারসহ আনুষঙ্গিক সামগ্রীতে বিকল্প সরবরাহকারীর সুযোগ সীমিত হলে ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
৭০ কোটি, দেড় কোটি, এবার ১৬০ কোটি
প্রকল্পটি ২০২০ সালে অনুমোদন পেলেও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রথম দরপত্রে ৭০ কোটি টাকার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। পরের দরপত্রে তা কমে দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকায়। এবার সেটি বেড়ে হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। অভিজ্ঞতার শর্তে এমন নাটকীয় ওঠানামার কারণ কী? একই প্রকল্পে একবার ১৫ ইঞ্চি মনিটরের আধুনিক মেশিন চেয়ে পরে তা ১০ ইঞ্চিতে নামানো হলো কেন?
প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, টেকনিক্যাল কমিটির পর্যালোচনার পর প্রয়োজন হলে স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করা হবে এবং দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এই বক্তব্যই এখন বড় পরীক্ষা। দরপত্র সত্যিই উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক করার উদ্দেশ্য থাকলে অস্বাভাবিক শর্তগুলো প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করতে বাধা কোথায়?
মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
এত বড় সরকারি ক্রয়ে বারবার স্পেসিফিকেশন বদলের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরদারি কতটা রয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। তবে কীভাবে এবং কার সুপারিশে এসব কারিগরি শর্ত বদলাচ্ছে, মন্ত্রী তা জানেন কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়ে থাকলে তার পেছনে কার প্রভাব কাজ করছে, তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। কারণ এই ক্রয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার কিডনি রোগীর জীবন, সরকারি অর্থ এবং আগামী বহু বছরের চিকিৎসা ব্যয়।
যে পাঁচ প্রশ্নের জবাব দরকার
১০৩০টি মেশিন কেনার আগে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে:
- মনিটর ১৫ ইঞ্চি থেকে ১০ ইঞ্চি করার কারিগরি যুক্তি কী?
- কম ফিচারের মেশিনের সম্ভাব্য দাম কেন বাড়ছে?
- ১৬০ কোটি টাকার অভিজ্ঞতার শর্ত কিসের ভিত্তিতে ঠিক করা হলো?
- ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোম্পানির ডায়ালাইজার বা রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হবে কি না?
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতেই কি দরপত্রের শর্ত বদলানো হয়েছে?
কিডনি রোগীর চিকিৎসাকে ঘিরে ব্যবসায়িক স্বার্থের সুযোগ তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হবে রোগী ও রাষ্ট্রকেই। তাই এই দরপত্রে কারিগরি স্বচ্ছতার পাশাপাশি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি। কেনাকাটা হবে সরকারি অর্থে; সুবিধা কার ঘরে যাবে, সে উত্তর এবার আগেই দিতে হবে।
