মশারি-লুঙ্গির পরামর্শে কি ঠেকবে ডেঙ্গু? সংসদে মন্ত্রীর জবাবে জবাবদিহির প্রশ্ন
প্রতিরোধের দায়িত্ব সরকারের, অথচ আলোচনার কেন্দ্রে এখন নাগরিকের পোশাক
ডেঙ্গু নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ, আর সেই সময়ে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখে শোনা গেল মশারির ভেতরে ঘুমানোর কথা। ফুলহাতা শার্ট এবং লম্বা পায়জামা বা লুঙ্গি পরার পরামর্শও দিয়েছেন মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গত ১৫ জুলাই এক জরুরি জনস্বার্থের নোটিশের জবাবে তিনি এসব বলেন। ব্যক্তিগত সতর্কতার এই কথাগুলো ফেলনা নয়, তবে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের নিজের করণীয় নিয়ে মন্ত্রী কতটা স্পষ্ট ছিলেন।
যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
সংসদে মন্ত্রী জানান, মানুষকে মশারি ব্যবহার ও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে সচেতন করা হচ্ছে। কিন্তু জনগণ যা জানতে চায়, তার তালিকা আরও দীর্ঘ:
• কোন এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চলছে?
• মশার প্রজননস্থল কোথায়, কীভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে?
• নজরদারির ফলাফল কী?
• রোগীর চাপ বাড়লে সেবা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
• হাসপাতালগুলো কি সত্যিই প্রস্তুত?
এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব মন্ত্রীর বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।
বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ শয্যা: ঘোষণা থেকে বাস্তবতা
একই জবাবে মন্ত্রী বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১০ শতাংশ শয্যা রাখতে এবং সরকার নির্ধারিত হারে পরীক্ষা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জরুরি পদক্ষেপ। কিন্তু নির্দেশ দেওয়ার ঘোষণা আর মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব ফল এক নয়। নির্দেশ কতটা মানা হচ্ছে এবং তদারকি কীভাবে হচ্ছে, সেই তথ্য না পেলে ঘোষণা শুধু ঘোষণাই থেকে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে
ফুলহাতা পোশাক মশার কামড় এড়ানোর একটি উপায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাতেও তা আছে। কিন্তু সংস্থাটির পরামর্শ সেখানেই শেষ নয়। জমে থাকা পানি সরানো, পানির পাত্র ঢেকে রাখা ও নিয়মিত পরিষ্কার করা, মশা নিরোধক ব্যবহার এবং প্রজননস্থল কমানোর মতো ব্যবস্থাও সমান জরুরি। ফলে মন্ত্রীর পরামর্শ ভুল নয়, সমস্যা অন্যখানে: এমন পরামর্শ সামনে থাকলে সরকারি প্রতিরোধ ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি ও ঘাটতি আড়ালে চলে যায়। দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাছে মানুষের প্রত্যাশা তার চেয়ে বেশি।
লুঙ্গির দৈর্ঘ্য নাকি নীতির হিসাব
সংকটকালে মন্ত্রীর বক্তব্য হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর, নির্দিষ্ট এবং করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার। লুঙ্গি কতটা লম্বা করে পরতে হবে, এ ধরনের উদাহরণ সহজেই আলোচনার কেন্দ্র দখল করে নেয়, ফলে নীতিগত পদক্ষেপের হিসাব পেছনে পড়ে। অনেকেই এই বক্তব্যকে গুরুত্বহীন বা পরিস্থিতির তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করতে পারেন। সেটি বক্তব্যের প্রভাবের মূল্যায়ন, ব্যক্তিগত অপমান নয়।
শেষ কথা
ডেঙ্গু মোকাবিলায় নাগরিকের সতর্কতা দরকার, কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ভার সরকারের। তাই মন্ত্রীর কাছ থেকে শুধু সচেতনতার আহ্বান নয়, সময়সীমাসহ বাস্তব পরিকল্পনা, কাজের অগ্রগতির তথ্য এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রত্যাশিত। পোশাকের পরামর্শে দায় শেষ হয় না; মানুষ দেখতে চায় মশার উৎস কমাতে এবং আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে সরকার কী করছে।
