বদলি থেকে টেন্ডার: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রভাবশালী বলয়ের অভিযোগ

যুগ্মসচিব, মন্ত্রীর দপ্তর ও হাসপাতালের কেনাকাটাকে ঘিরে নানা দাবি শীর্ষনিউজের প্রতিবেদনে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সরকার পরিবর্তনের পরও আগের সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ প্রকাশ করেছে শীর্ষনিউজ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরনো চক্রগুলো নতুন করে সংগঠিত হয়ে মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক বলয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। নীতিনির্ধারকদের কাছে এসব পরিচিত মুখের গ্রহণযোগ্যতার কারণ হিসেবে অর্থের জোগান ও বিষয় ‘ম্যানেজ’ করার দক্ষতার কথা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বলয়ের নেতৃত্বে কারা
শীর্ষনিউজের বর্ণনা অনুযায়ী, যুগ্মসচিব (পার) মো. মুস্তাফিজুর রহমান চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন। তাঁকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের আত্মীয়, অর্থাৎ ভাগ্নি জামাই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও তিনজনকে নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকার কথা বলা হয়েছে:
• মন্ত্রীর এপিএস মোস্তাফিজুর রহমান
• সিএমএসডি পরিচালক ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ শফিউর রহমান
• মন্ত্রীর পিএস এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার
যেভাবে গড়ে উঠল বলয়
প্রতিবেদনের দাবি, যুগ্মসচিব এবং মন্ত্রীর এপিএস দুজনেরই গ্রামের বাড়ি মাগুরায়। এপিএস নিয়োগে যুগ্মসচিবের পছন্দ কাজ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে; প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাধারণত মন্ত্রীরা এ পদে নিজের পরিচিত বা এলাকার কাউকে বেছে নেন। আগের সরকারের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার সহযোগী হিসেবে মুস্তাফিজুর রহমান পরিচিত ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি রয়েছে।
বগুড়ায় বাড়ি সিএমএসডি পরিচালক শফিউর রহমানের। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের ‘ভাগিনা’ পরিচয় তাঁকে ক্ষমতাবান করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে সুবিধা নেওয়া এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে থাকার সময় প্লট জালিয়াতির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওই প্রতিবেদনে রয়েছে। পিএস ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকারের বিরুদ্ধে আগের সরকারের আমলে পদোন্নতিতে বৈষম্য এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থের বিনিময়ে জেলা প্রশাসকের পদ পাওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
বদলি-পদায়নে ‘রেট’
নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি পার অধিশাখার নিয়ন্ত্রণাধীন; এ কারণে এসব ক্ষেত্রে মুস্তাফিজুর রহমানের প্রভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতি পদায়নে ৫–১০ লাখ টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে ২০ লাখ বা বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় আগের সরকারের সময় অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়া কর্মকর্তারা লাভবান হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনের দাবি।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক, বরিশালের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জনের পদায়ন বাতিলের পেছনেও এসব অভিযোগের প্রভাব ছিল এবং এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে—এমন বক্তব্য প্রতিবেদনে এসেছে।
পুরনো ঠিকাদার, নতুন ছাতা
স্বাস্থ্যখাতের ছোট ঠিকাদার এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির কিছু কর্মচারী আগের ১৫ বছরে বেনামে ঠিকাদারি করে শত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল হওয়ায় গত দুই বছর বড় উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ ছিল; ফলে ঠিকাদারদের লক্ষ্য হাসপাতালের এমএসআর সামগ্রী কেনা—এমন বর্ণনাও রয়েছে। প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো হলো:
• দেশের এমএসআর ব্যবসা অল্প কয়েকজন ঠিকাদারের হাতে কেন্দ্রীভূত
• একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টেন্ডার ম্যানিপুলেশন
• হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে আগেভাগে পিই পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ; ভালো দরদাতার দরপত্রও বাতিল করা
পুরনো বিতর্কিত নামের প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবজাল হোসেন কারাগারে রয়েছেন। মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েক মাস কারাগারে ছিলেন বলেও উল্লেখ রয়েছে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘পর্দা কেলেঙ্কারি’তে পরিচিত সাজ্জাদ মুন্সী বর্তমান সিন্ডিকেটে যুক্ত—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে করা হয়েছে। ওই সূত্রের দাবি, মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর গোপন স্থানে বৈঠক হয়েছিল।
মনিরুজ্জামান ঢালী, এমদাদ হোসেন এবং রবিউল ইসলামের নামও টেন্ডার-চক্রের প্রসঙ্গে এসেছে। মাদারীপুরের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মিরাজ হোসেনের ঠিকাদারি কার্যক্রম এখনো দাপটের সঙ্গে চলছে বলেও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
সিএমএসডি ও দুদকের অসমাপ্ত অধ্যায়
সিএমএসডি-র কেনাকাটা এই চক্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করেছে প্রতিবেদনটি। কাজ কার কাছে যাবে, তা চক্রটি নির্ধারণ করে এবং তাদের বাইরে কেউ এক টাকার কাজও পায় না—এমন অভিযোগও সেখানে রয়েছে।
দুদক ২০১৯ সালে ২৩ জন এবং ২০২০ সালে আরও ১২ জন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত পরে থেমে যায় এবং অভিযুক্তদের অধিকাংশ আগের মতো সক্রিয়—এ দাবিও একই প্রতিবেদনের।
চিকিৎসক সংগঠনেও প্রভাব?
বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব কয়েকটি ভাগে বিভক্ত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সিন্ডিকেট সেই বিভাজন কাজে লাগাচ্ছে—এমন অভিযোগের পাশাপাশি কিছু নেতাকে সীমিত সুবিধা দিয়ে অন্যদের চাপে রাখা এবং বিরোধ উসকে দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছবি: এআই এর মাধ্যমে তৈরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *