হামের টিকা নিয়ে মন্ত্রীর দাবি ফ্যাক্ট-চেকে ভুল প্রমাণিত, প্রশ্নের মুখে জবাবদিহি
“আট বছরে কোনো টিকা দেওয়া হয়নি”—স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের বিপরীতে মিলেছে ২০২০-২১ সালের দেশব্যাপী ক্যাম্পেইনের প্রমাণ; কিছুদিন পর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও একই ধরনের ভুল
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব যখন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছিল, তখনই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের একটি বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করে। ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ রাজধানীর এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি দাবি করেন, গত আট বছরে দেশে হামের কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি; শেষ টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল আট বছর আগে। প্রাদুর্ভাবের মধ্যে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের কাছে কথাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু স্বাধীন তথ্য-যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে অন্য চিত্র বেরিয়ে আসে।
ফ্যাক্ট-চেক প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব বক্তব্যটি যাচাই করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখানো হয়, মন্ত্রীর দাবি সঠিক নয়। টিকাদানের মতো স্পর্শকাতর কর্মসূচি নিয়ে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এমন তথ্য প্রকাশ্যে বলা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে।
প্রাদুর্ভাবের পটভূমি
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়। এরপর সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় ঢাকার বিভিন্ন বস্তি এলাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে। মার্চের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে; একের পর এক শিশুর মৃত্যুর খবরে হাসপাতালে চাপ বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে ২৯ মার্চ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সামনে মন্ত্রী বলেন, হামের রোগী উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং সর্বশেষ টিকাদান কর্মসূচি আট বছর আগে হয়েছিল; এরপর কোনো সরকারই টিকা দেয়নি। তিনি আরও জানান, নতুন টিকা কেনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং ক্রয় কমিটির অনুমোদনও হয়ে গেছে। বক্তব্যটি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়, আর প্রকাশের পরপরই ফ্যাক্ট-চেক প্রতিষ্ঠানগুলো তা খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
যাচাইয়ে যা মিলল
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশজুড়ে একটি বড় হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছিল। এতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশু টিকা পায়। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও ক্যাম্পেইনের সত্যতা নিশ্চিত হয়। এ ছাড়া নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায়ও হামের টিকা চালু ছিল বলে প্রমাণ মেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রী সম্ভবত বড় পরিসরের ক্যাম্পেইনের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা সরাসরি বিভ্রান্তিকর।
যাচাইকারীরা আরও দেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের একটি অসম্পূর্ণ স্ক্রিনশট ছড়িয়েছে, যাতে ২০২৫ সালের টিকাদান কভারেজ মাত্র ৫৭ শতাংশ দেখানো হয়েছে। ইপিআইয়ের উপ-পরিচালক নিশ্চিত করেন, ওই তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল। ২০২৫ সালে হামের প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৯২ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯০ শতাংশ; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ও তা নিশ্চিত করেছে।
সমালোচনা ও গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাদুর্ভাবের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অতীতের প্রকৃত টিকাদান কর্মসূচিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকিও তৈরি করে। সমালোচকদের যুক্তি, টিকার মজুতে ঘাটতি, ক্রয়প্রক্রিয়ায় দেরি কিংবা রুটিন কর্মসূচি বাস্তবায়নের দুর্বলতার মতো প্রকৃত সংকট নিয়ে খোলামেলা কথা না বলে অতীতের সরকারের ওপর দায় চাপাতে গিয়ে মন্ত্রী এমন তথ্য দিয়েছেন, যা যাচাইয়ে টেকে না। এতে সমস্যা সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক দোষারোপই বেশি প্রতিফলিত হয়েছে বলে অভিযোগ।
একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বক্তব্যটিকে ভুল তথ্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ছড়ানো ভুল তথ্য জনস্বাস্থ্য সংকটকে কীভাবে জটিল করছে, তা নিয়ে তারা উদ্বেগ জানিয়েছে।
তিন সপ্তাহ পর প্রধানমন্ত্রীর মুখেও একই সুর
মন্ত্রীর মন্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই তিন সপ্তাহ পর, ১৮ এপ্রিল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অনুরূপ কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত দুই সরকারের ব্যর্থতায় দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়নি, যা তাঁর ভাষায় ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’।
ফ্যাক্ট-চেকে এই দাবিও ভুল প্রমাণিত হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিগত দুই সরকারের সময়েই বড় পরিসরে হামের টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির ক্যাম্পেইনে কক্সবাজারকে ‘রেড জোন’ চিহ্নিত করে সেখানেও প্রায় আট লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। দিনাজপুর ও জামালপুরসহ বিভিন্ন উপজেলা পরিষদের নথি এবং বেসরকারি সংস্থা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কার্যক্রমেও এর স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। অল্প সময়ের ব্যবধানে সরকারের শীর্ষ দুই ব্যক্তির মুখে একই ধরনের ভুল তথ্য আসায় পর্যবেক্ষকেরা একে বিচ্ছিন্ন ভুল মনে করছেন না; তাঁদের মতে, এটি সরকারি বক্তব্যে তথ্য যাচাইয়ের ঘাটতি ও দায়বদ্ধতার অভাবের উদাহরণ।
অভিভাবকদের সংশয়
এই বক্তব্যের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। যেসব অভিভাবক সন্তানদের হামের টিকা দিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ নতুন করে সংশয়ে পড়েছেন—সন্তান আসলেই সঠিক টিকা পেয়েছিল কি না। এই অনিশ্চয়তা এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ও মৃত্যুর হার দুটিই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমন ভুল তথ্য টিকার প্রতি অহেতুক অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে, যা প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে ক্ষতিকর।
সংশোধনের অপেক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, জনসমক্ষে দেওয়া তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা মন্ত্রীর দায়িত্বেরই অংশ। অথচ ফ্যাক্ট-চেকে গরমিল ধরা পড়ার পরও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার বা সংশোধনী বিবৃতি আসেনি, যা সমালোচকদের কাছে আরও উদ্বেগজনক। প্রকৃত ঘাটতি থাকলে—যেমন টিকা সংগ্রহে দেরি বা মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—তা খোলাখুলি স্বীকার করে সমাধানের পথ দেখানোই ছিল প্রত্যাশিত।
প্রাদুর্ভাবের সময় মানুষের সবচেয়ে বেশি দরকার নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত তথ্য। সংকট মোকাবিলার নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের বক্তব্যই যদি ফ্যাক্ট-চেকে টেকে না, তবে জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে চাই স্বচ্ছ ব্যাখ্যা, দ্রুত সংশোধন এবং দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত।
