স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষণে জ্বালানি আর তিস্তা, হাসপাতালের কথা কই?
বিএনপির মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় গুরুত্ব পেয়েছে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ; স্বাস্থ্যসেবার সংকট নিয়ে মন্ত্রীর অবস্থান জানতে চান সমালোচকেরা
মানিকগঞ্জে বিএনপির এক মতবিনিময় সভায় দেওয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুলের বক্তব্য নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—নিজের মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নিয়ে মন্ত্রী কতটা কথা বলছেন? রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মানিকগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির ওই সভায় প্রধান অতিথির ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তিস্তা।
ভাষণের মূল প্রসঙ্গ
মন্ত্রীর দীর্ঘ বক্তব্যে যেসব বিষয় উঠে এসেছে:
- বঙ্গোপসাগরে ভারত ও মিয়ানমারের গ্যাস উত্তোলন এবং সাগরের নিচে বাংলাদেশেরও বিপুল গ্যাস থাকার দাবি;
- আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে আলোচনা করে তারেক রহমানের গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করার কথা;
- আদানির বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ ঘাটতি, কুইক রেন্টাল ও সার;
- ভারতীয় প্রভাব, ফারাক্কা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ; ও
- তিস্তা ব্যারেজ ও চীনের সহযোগিতা।
অতীত সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় মন্ত্রী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভারতীয় ‘অনুচর’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’দেরও উল্লেখ করেন। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর বক্তৃতার কেন্দ্রে স্বাস্থ্য ছিল না।
যে সংকট থেকে যায় আড়ালে
সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ, শয্যাসংকট, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, ওষুধ সরবরাহ, বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়, জরুরি সেবা, জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা—স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই বাস্তবতায় মন্ত্রীর জবাবদিহির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি বলে মনে করেন সমালোচকেরা।
তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মন্ত্রী রাজনৈতিক বক্তব্যে সক্রিয় হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূল সমস্যাগুলো তুলনামূলকভাবে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তাঁরা জানতে চান:
- দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রী কোন কোন সংকট চিহ্নিত করেছেন;
- কোন সমস্যার সমাধান হয়েছে;
- আগামী এক বছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য তাঁর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কী; এবং
- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ কি রাজনৈতিক মঞ্চে অতীত সরকারের ব্যর্থতার হিসাব দেওয়া, নাকি বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমস্যা সমাধান করা।
সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা ও তার পরের প্রশ্ন
মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে হাসপাতালগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা এসেছে। এটি স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বিষয় হলেও সমালোচকদের প্রশ্ন, হাসপাতাল সৌরবিদ্যুতে চললেই কি সেখানে যথেষ্ট চিকিৎসক থাকবেন, ওষুধ মিলবে এবং রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবেন? সেবার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিও তাঁদের প্রশ্ন।
রোগী ও পরিবারের হিসাব
অতীত সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা, আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি, কুইক রেন্টাল, গ্যাস অনুসন্ধান কিংবা পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক রাজনীতিতে স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকারের মন্ত্রীর কাছে জনগণের প্রত্যাশা সমাধানের হিসাব পাওয়া।
একটি দরিদ্র পরিবারের কাছে আদানির বিদ্যুতের পরিমাণের চেয়ে বড় হিসাব চিকিৎসার খরচ। রোগীর স্বজনের কাছে তিস্তা ব্যারেজের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হলেও জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ শয্যা পাওয়াই তখন মুখ্য প্রশ্ন। আর সাগরতলে কত ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আছে, সেটি বড় কথা হলেও একজন রোগীর কাছে আগে জরুরি হাসপাতালে শয্যা মিলবে কি না।
বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে; কিন্তু চিকিৎসা না পেলে রোগীর দুর্ভোগ সরাসরি ও তাৎক্ষণিক। এ কারণেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি আরও জরুরি।
অগ্রাধিকার নিয়ে সমালোচনা
সমালোচকদের মতে, সমস্যা মন্ত্রীর কথা বলায় নয়, বরং কোন কথা কতটা বলছেন—সেই বিন্যাসে। রাজনৈতিক সভায় রাজনৈতিক বক্তব্য অস্বাভাবিক না হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির প্রতিটি বড় জনসমক্ষ বক্তব্যে সেই মন্ত্রণালয়ের বিষয় স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশিত।
গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা তিস্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে প্রতিদিন মানুষের জীবন ও অর্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, সেখানে প্রশ্নটি থেকেই যায়—স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মাইক্রোফোনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কথা এত কম কেন?
