হাসপাতালে মন্ত্রীর ঘন ঘন পরিদর্শন, তবু অচল ৬২ শতাংশ অক্সিজেন প্লান্ট

বাথরুম, খাবার আর হাজিরা দেখাই কি অগ্রাধিকার? জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন ব্যবস্থার সংকটে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সময় এখন যেন কাটছে হাসপাতাল পরিদর্শনেই। আজ এক জেলায়, কাল আরেক জেলায়—আকস্মিক হাজির হয়ে তিনি দেখছেন কর্মকর্তারা কর্মস্থলে আছেন কি না, রোগীদের খাবারের মান কেমন, শৌচাগার পরিচ্ছন্ন কি না। সঙ্গে থাকে ক্যামেরা। পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের সামনে একের পর এক ঘোষণা—এটি ঠিক করা হবে, ওটির উন্নতি হবে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দৃশ্যমান তৎপরতার আড়ালে প্রশ্ন

তবে এই দৃশ্যমান তৎপরতার বাইরে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে জরুরি সংকটগুলো নিয়ে মন্ত্রীর কার্যকর উদ্যোগ কোথায়—সেই প্রশ্নই এখন জোরালো হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসক-নার্সসহ জনবলের ঘাটতি, ওষুধ সরবরাহে অনিয়ম, জরুরি চিকিৎসাসেবার দুর্বলতা এবং জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন ব্যবস্থা—এসব বিষয় সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। এমন বাস্তবতায় শৌচাগার পরিষ্কার আছে কি না কিংবা কোন কর্মকর্তা অনুপস্থিত—এগুলোই কি একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত?

৬২ শতাংশ অক্সিজেন প্লান্ট অচল

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর অক্সিজেন প্লান্টের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোর ৬২ শতাংশ অক্সিজেন প্লান্টই অচল। অক্সিজেন হাসপাতালের সাজসজ্জার উপকরণ নয়; মুমূর্ষু রোগীর কাছে এটি প্রাণ বাঁচানোর অন্যতম মৌলিক উপাদান। এমন গুরুতর বাস্তবতা সামনে আসার পরও মন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যে বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

পরিদর্শন দায়িত্বের অংশ, কিন্তু শেষ কথা নয়

হাসপাতালে গিয়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি, রোগীর খাবার কিংবা পরিচ্ছন্নতা দেখা নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব কেবল পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিদর্শনে ধরা পড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাও তাঁর কাজ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বললেই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে না। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহি, বাজেটের যথাযথ ব্যবহার ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা।

এখানেই সমালোচনার জায়গাটি তৈরি হয়েছে। পরিদর্শনের তৎপরতা যতটা চোখে পড়ে, কাঠামোগত সংকট মোকাবিলায় দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য ফল ততটা মিলছে কি না, তার স্পষ্ট উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে এখনো নেই।

অগ্রাধিকার কোথায়?

কখনো কখনো স্বাস্থ্যের মূল দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যে বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের মতো প্রসঙ্গও উঠে আসে। হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন প্লান্ট যখন অচল, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারকের কথায় সেই সংকটের চেয়ে সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেলে মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার আসলে কোথায়—এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

জনগণ কী চায়

জনগণের প্রত্যাশা অতিরিক্ত কিছু নয়। কে উপস্থিত, কে অনুপস্থিত—শুধু তা দেখা নয়; চিকিৎসক-সংকট কেন তৈরি হচ্ছে, যন্ত্রপাতি কেন অকেজো পড়ে থাকে, অক্সিজেন প্লান্ট কেন সচল রাখা যাচ্ছে না, প্রয়োজনীয় সেবার জন্য রোগীকে কেন বেসরকারি হাসপাতালে ছুটতে হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর ও সমাধানই তাঁরা চান।

স্বাস্থ্য খাতে জনপ্রিয়তার পথ আকস্মিক হাজির হওয়ার মধ্যে নয়; বরং এমন একটি সরকারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে, যেখানে রোগী সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাবে, অক্সিজেনের জন্য ছোটাছুটি করতে হবে না, আর সেবা পেতে মন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের মুখাপেক্ষী হতে হবে না।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

ক্যামেরার সামনে হাসপাতাল পরিদর্শন সহজ। কিন্তু অচল অক্সিজেন প্লান্ট সচল করা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা সারানো অনেক কঠিন। সেই কঠিন কাজেই এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রশ্ন তাই একটাই—মন্ত্রী কি দৃশ্যমান পরিদর্শনের গণ্ডিতেই থাকবেন, নাকি ৬২ শতাংশ অচল অক্সিজেন প্লান্টের মতো জীবন-মরণ সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর নেতৃত্বের প্রমাণ দেবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *