জনবল-সংকট অমীমাংসিত রেখে পরিদর্শনে জোর: স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কৌশলে কতটা মিলছে সেবা?

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অন্তত ৩০টি সরকারি হাসপাতালে আকস্মিকভাবে হাজির হয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। কখনো ফার্মেসিতে, কখনো প্যাথলজি বিভাগে, কখনো রান্নাঘরে—ঘুরে ঘুরে অনিয়ম খুঁজেছেন তিনি। তালিকায় সাতক্ষীরা, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও সিলেটের একাধিক হাসপাতাল রয়েছে। বদলি, বরখাস্ত কিংবা প্রকাশ্য ভর্ৎসনার ভিডিও ছড়িয়েছে অনলাইনে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কৌশল কি দেশের স্বাস্থ্যসেবার সংকট মেটাচ্ছে, না কেবল সাময়িক চাপ তৈরি করছে?
১. পরিদর্শনের পর কী বদলাল
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও সিলেটের তিনটি হাসপাতালে মন্ত্রীর পরিদর্শনের আগে-পরের অবস্থা যাচাই করেছে। ফল: আগের মতোই অপরিচ্ছন্নতা, ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনা। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিদর্শনের চার মাস পরও ওয়ার্ডে আবর্জনা, উন্মুক্ত চিকিৎসা-বর্জ্য ও পড়ে থাকা সিরিঞ্জ দেখা গেছে। হবিগঞ্জে ২৯ আগস্টের পর কিছুদিন উন্নতি টিকেছিল, তারপর পুরোনো অবস্থা। প্রতিবেদনটির গুরুত্ব এখানেই যে, এতে শুধু রোগীর অভিযোগ নয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব হিসাবও উঠে এসেছে। সিলেটে সাত দিনে সমাধানের ঘোষণা দিয়েও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
২. সংখ্যা যা বলছে
সমস্যার গোড়া লুকিয়ে আছে সংখ্যায়। কুমিল্লায় ১২৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রয়োজনে আছেন ৫৩ জন। সিলেটে দরকার ৫০০ থেকে ৬০০ জন, আছেন ২৬২ জন। ওসমানী হাসপাতালের হৃদরোগ ওয়ার্ডে ৪০ জনের জায়গায় ১২০ রোগী; পুরো হাসপাতালে ৯০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী। কুমিল্লায়ও শয্যার প্রায় তিন গুণ রোগী। এই বাস্তবতায় পরিদর্শনের ভয় দেখিয়ে পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব, অথচ কুমিল্লায় মন্ত্রী নিজেই ভয়ের ওপর ভর করে উন্নতির আশা করেছিলেন। ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিনুর রশিদ ইয়াছিনের টয়লেট ঠিক করার নির্দেশের এক মাস পরও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।
৩. রোগীর খরচ ও দুর্ভোগ
হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় অংশ এবং অনেক পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হচ্ছে; যন্ত্রপাতি বিকল, নার্সদের সাড়াও অনিয়মিত। মন্ত্রী সেদিন চিকিৎসক ও শয্যা বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। একজন কর্মীকে বদলি করে ফার্মেসির সংকট মেটে না; দরকার ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আমিনুল হক সরকারও স্থায়ী উন্নতির পথে প্রধান বাধা হিসেবে জনবল ও চিকিৎসকের অভাবের কথাই বলছেন। ওসমানী হাসপাতালের এক কর্মকর্তা পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করলেও সরেজমিনে তা চোখে পড়েনি।
৪. দায় কার, জবাবদিহি কার
চিকিৎসকদের একটি অংশের অভিযোগ, পরিদর্শনে ব্যক্তির অনুপস্থিতি যত গুরুত্ব পায়, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা তত নয়। প্যাথলজি ল্যাব চালু না থাকলে দায় কি শুধু চিকিৎসকের, নাকি প্রশাসন, স্টোর ও সরবরাহেরও—এই প্রশ্ন তুলেছেন ডা. আসিফ। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব বলেছেন, পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার মন্ত্রীর আছে, তবে অভিযোগ উঠলে বিধি অনুযায়ী তদন্তই হওয়া উচিত। জনসমক্ষে ধমক রোগী ও চিকিৎসককে মুখোমুখি দাঁড় করালে হামলার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
৫. মন্ত্রীর অবস্থান
মন্ত্রী মনে করেন, দীর্ঘদিনের দুরবস্থা কাটাতে তাঁর পদক্ষেপে সুফল মিলছে। জনবল নিয়ে তাঁর উত্তর: এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা আছে, উপজেলা পর্যন্ত যন্ত্রপাতিও পৌঁছাবে। ঘোষণা ভালো, তবে সময়সীমা ছাড়া তা প্রতিশ্রুতিই থেকে যায়, কাজে পরিণত হয় না। পরিদর্শনের যৌক্তিকতায় মন্ত্রীর যুক্তি, কর্মস্থলে চিকিৎসক না পেলে ব্যবস্থা নেওয়া তাঁর দায়িত্ব; আগে নোটিস দিয়ে কারণ দর্শানো হয়, সন্তোষজনক জবাব না মিললে তবেই বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ।
৬. এখন কী করা দরকার
স্থায়ী সমাধানের জন্য নিয়োগের সময়সূচি প্রকাশ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের ধারা পুনরায় চালু, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত সরবরাহ এবং প্রতিটি হাসপাতালের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও অগ্রগতির প্রতিবেদন জরুরি। অভিযোগ প্রমাণ হলে বিধি মেনে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, কিন্তু সেটিই যেন মূল কৌশল না হয়ে ওঠে।
সমাপনী
পরিদর্শন দোষের নয়; কিন্তু তা সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না। নিয়োগ, সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সমাধানের সময়সূচি জনসমক্ষে না আনলে প্রতিটি অভিযান আলোচনার খোরাক হয়ে থাকবে, সেবার মান বদলাবে না। আর শেষ বিচারে মাপকাঠি হবে একটাই—মন্ত্রী চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরও রোগী ও স্বজনরা হাসপাতালে কী দেখছেন।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *