রাতের অন্ধকারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো রাড্ডা সেন্টার

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নীরবতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে নেমে এলো এক নজিরবিহীন তাণ্ডব। নিরাপত্তাকর্মীদের হাত-পা বেঁধে জিম্মি করে মধ্যরাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে চালানো হলো ভাঙচুর, লুটপাট আর নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ। মুখোশে মুখ ঢাকা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীদের বশে আনে, এরপর একে একে সরিয়ে নেয় মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ অর্থ ও অন্যান্য সম্পদ। লুটপাটেই থেমে থাকেনি হামলাকারীরা—ভারী যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা নাগাদ সংঘটিত এই ঘটনা এখন জন্ম দিয়েছে একের পর এক প্রশ্নের। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এত বিশাল মাত্রার ধ্বংসযজ্ঞ কীভাবে ঘটতে পারল? ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ছিল কোথায়? আর ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাই বা কী?
অভিযোগ উঠেছে, ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এই তাণ্ডব চালানো হয়েছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতারের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের এক কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করেছেন তিনি।
তবে থানায় দায়ের হওয়া মামলার বাইরেও উঠে এসেছে আরও গভীর কিছু প্রশ্ন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কীভাবে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল? দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি সহযোগে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাল কীভাবে? নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করার পরও কেন তাৎক্ষণিক আইনি বা প্রশাসনিক প্রতিরোধ গড়ে উঠল না? আর একটি দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
কার ইশারায় এই ধ্বংসযজ্ঞ?
ঘটনার নেপথ্যে প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে জোর আলোচনা। একাধিক সূত্রের বরাতে শোনা যাচ্ছে, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশনা বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এত বড় মাপের অভিযান পরিচালনা করা আদৌ সম্ভব কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র বা স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি বলে বিষয়টিকে আপাতত তদন্তাধীন হিসেবেই বিবেচনা করা সংগত। প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে হামলাকারীদের পাশাপাশি এর পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সম্ভাব্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায় কোথায়?
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ঘিরে। কারণ রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়—এটি দীর্ঘদিন ধরে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়ের কাছে তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠছে প্রশ্ন—এমন ভয়াবহ হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কী ছিল? ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা এখন কোথায় সেবা পাবেন? লুট হওয়া ওষুধ ও ভ্যাকসিনের হিসাব কী? ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনাই বা কী? এবং সর্বোপরি, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কতটা তৎপর?
সমালোচকদের অভিমত, স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে এমন ঘটনায় আরও দৃশ্যমান ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত ছিল। মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে, তবে সেই প্রশ্নের জবাবও জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই ধ্বংসযজ্ঞের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত তাকে সরাসরি ঘটনায় জড়িত বলার সুযোগ নেই। তবে একটি বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি—
কোনো ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না থাকা, আর সেই ঘটনার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন থাকা—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
মন্ত্রীর দায়িত্বের জায়গা থেকেই তাই তার অবস্থান, গৃহীত পদক্ষেপ ও দিকনির্দেশনা জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পাঁচ দশকের সেবার পরিণতি কয়েক ঘণ্টার ধ্বংসস্তূপ
১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। তৎকালীন সুইডিশ সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্র বছরের পর বছর ধরে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের সেবায় নিয়োজিত একটি প্রতিষ্ঠান যদি এক রাতের অন্ধকারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে তা কেবল কয়েকটি ভবন ভাঙার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার, বিপুল পরিমাণ জনসম্পদ এবং দীর্ঘদিনের একটি জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা।
অমীমাংসিত প্রশ্ন
এখন মূল প্রশ্ন একটিই—রাড্ডা সেন্টার ধ্বংসের ঘটনায় শুধু একটি মামলাই দায়ের হবে, নাকি এর পেছনের সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক একদিন প্রকাশ্যে আসবে? আর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং জনগণের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সুরক্ষায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে ঠিক কী পদক্ষেপ নিয়েছেন—তার সদুত্তর কি মিলবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মেলা পর্যন্ত রাড্ডা সেন্টার ধ্বংসের ঘটনা কেবল একটি ভাঙচুরের মামলা হয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি হয়ে উঠবে স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক জবাবদিহিরও এক বড় পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *